গ্রীষ্মকালীন মুগের চাষ
মুগ চাযের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এই যে, নাইট্রোজেনকে সংরক্ষণ করে তা জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং এতে পরবর্তী ফসলের চাষে নাইট্রোজেন কম লাগে। উপযুক্ত সাথী ফসলের সঙ্গে মুগের চাষ করলে আর্থিক লাভ বেশি হবে, তবে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চাষ করা প্রয়োজন। জানাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম কৃষিঅধিকর্তা সৌমেন্দ্রনাথ দাস।
মুগ একটি স্বল্পমেয়াদি ডালশস্য। পশ্চিমবঙ্গে শ্রীষ্মকালে এই ডালশস্যের চাষ হয় প্রায় ১৬,০৫০ হেক্টর জমিতে। মুগডাল প্রোটিন এবং খনিজ মৌল সমৃদ্ধ খাদ্যশস্য। এই শিম্বগোত্রীয় ডালের শিকড়ে বসবাসকারী গুঁটির মধ্যে থাকা রাইজোবিয়াম জীবাণু, বাতাসের নাইট্রোজেনকে আবদ্ধ করার (হেক্টর প্রতি ৪০-৫০ কেজি) মাধ্যমে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং এর ফলে পরবর্তী ফসল চাষে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম লাগে। আশানুরূপ ফলন পেতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে।
গ্রীষ্মকালীন মুগ চাষের জন্য বীজ বোনার উপযুক্ত সময় ফাল্গুন-চৈত্র মাস। গ্রীষ্মকালীন মুগ চাষের উপযোগী জাত: পুসা বিশাল, স্নেহা, পন্থমুগ-৫ ও সম্রাট।
জমি নির্বাচন
উর্বর দোঁয়াশ মাটি বা বেলে-দোঁয়াশ মাটি, যেখানে জলনিকাশির সুব্যবস্থা আছে, মুগের চাষ সেই জমিতে লাভজনক ভাবে করা যায়। কাদা বা এঁটেল মাটিতে সহজে জল দাঁড়িয়ে যায় বলে.এই সব মাটিতে মুগ ভালো হয় না। মুগ কিছুটা খরা সহ্য করতে পারে।
জমি তৈরি
খরিফ ফসলের জন্য মৌসুমী বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমি তৈরির ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাক-খরিফ মরসুমে জমিতে রসের ঘাটতি থাকলে সেচ দিয়ে জমি তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাধারণত ৩-৪ বার চাষ ও মই দিলে জমি মুগ চাষের উপযুক্ত হয়। জমির সমস্ত আগাছা পরিষ্কার করা দরকার। জল নিকাশির সুব্যবস্থা থাকা দরকার।
বীজ বপনের আগে
রাইজোবিয়াম প্রজাতির জীবাণুসার বীজের সঙ্গে মিশিয়ে বপন করতে হবে। মিশ্রণের পদ্ধতিটি এরকম:
- বীজ বপনের আগে ঠান্ডা জলে বীজগুলিকে আধঘণ্টার মতো ভিজিয়ে ওই জল ফেলে দিতে হবে।
- ১০০-১৫০ গ্রাম চিটেগুড় ১ লিটার পরিষ্কার জলে মিশিয়ে আধঘণ্টার মতো ফোটাতে হবে এবং ঠান্ডা করে নিতে হবে।
- ২০০ গ্রাম জীবাণুসার ওই গুড়ের দ্রবণে দিয়ে ভালো করে নেড়ে নিতে হবে।
- বীজগুলিকে ওই গুড়ের মিশ্রণে ভালো ভাবে ভিজিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে নিতে হবে। রৌদ্রে শুকানো যাবে না।
বীজ বোনার পদ্ধতি
ভালো পরিচর্যা ও বেশি ফলনের জন্য বীজ সারিতে বোনা দরকার। সে ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ কেজি বীজ লাগবে। সাধারণত দু'টি সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেমি এবং প্রতি সারিতে দু'টি গাছের দূরত্ব ১০ সেমি রাখা হয়। আর, ছিটিয়ে বুনলে হেক্টর প্রতি ৩০-৪০ কেজি বীজের দরকার হবে।
বীজ বোনার এক সপ্তাহ আগে, প্রতি কেজি বীজের সঙ্গে কার্বেন্ডাজিম বা থাইরাম ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করে নিতে হবে।
জমির ৪-৫ সেমি গভীরতায় বীজ বপন করতে হবে।
সার প্রয়োগ
প্রথম চাষের সময় হেক্টর প্রতি ৫০-৬০ কুইন্টাল গোবর বা আবর্জনা সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। জমি তৈরির সময় মূল সার হিসাবে হেক্টর প্রতি ২০, ৪০ ও ২০ কেজি হারে নাইট্রোজেন, ফসফেট ও পটাশ যথাক্রমে ইউরিয়া (৪৩ কেজি), সিঙ্গল সুপার ফসফেট (২৫০ কেজি) এবং মিউরিয়েট অব পটাশের (৩৩ কেজি) মাধ্যমে প্রয়োগ করতে হবে। ফসফেটঘটিত সার হিসাবে সিঙ্গল সুপার ফসফেট ব্যবহার না করলে আলাদা ভাবে হেক্টর প্রতি ২০ কেজি সালফার প্রয়োগ করতে হবে।
পরিচর্যা
- মাটিতে অণুখাদ্যের অভাব হলে বীজ বোনার ২৫-৩০ দিনের মাথায় ০.২ শতাংশ বোরাক্স দ্রবণের সঙ্গে ০.০৫ শতাংশ অ্যামোনিয়াম মলিবডেট দ্রবণ মিশিয়ে পাতায় স্প্রে করে বোরন ও মলিবডেনামের ঘাটতি মেটানো যায়।
- চারা বোনার ৩ সপ্তাহ পর একবার আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে সবল গাছগুলো রেখে বাকি গাছ পাতলা করে দিতে হবে।
জলসেচ
খরিফ মরসুমে সেচের প্রয়োজন হয় না। প্রাক-খরিফ মরসুমে মাটিতে রসের ঘাটতি হলে বীজ বোনার আগে একটি সেচ এবং ২৫ দিনের মাথায় আর-একটি সেচ দেওয়া হয়। ফুল আসার আগে সেচ দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। সেচের সুবিধা থাকলে প্রয়োজন বোধে বোনার আগে একটি, ফুল আসার আগে একটি এবং দানা পুষ্ট হওয়ার সময় আরও একটি সেচ দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
সাথী ফসল
আখ, তিল, তোসা পাটের সাথী ফসল হিসাবে মুগ চাষ করলে অপেক্ষাকৃত বেশি আয় পাওয়া যায়। অড়হড়, তুলো, জোয়ার, ভুট্টা ইত্যাদির সঙ্গেও চাষ করা যায়। ভুট্টা, জোয়ার ও বাজরার চাষ করলে হলুদ কুটে রোগ ও শুটি ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ কম হয়।
ফসল তোলা
বেশি ফলন পেতে গেলে ২ থেকে ৩ বার পাকা শুঁটি তোলা দরকার। বীজ বপনের ৫০-৬০ দিনের মধ্যে প্রথম বার পাকা শুটি তোলা হয়। তার ১০-১৫ দিন পর অধিকাংশ শুঁটি পেকে গেলে (৭৫-৮০ শতাংশ) দ্বিতীয় বার শুটি তোলা হয়। পরবর্তী ফসল বোনার সময় এসে গেলে, বাকি শুঁটি পাকার জন্য অপেক্ষা না করে, গাছগুলিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে। যদি আরও ১০-১৫ দিন অপেক্ষা করা সম্ভব হয়, তাহলে সমস্ত শুটি পেকে গেলে গাছগুলিকে কেটে নেওয়া যায়।
সাধারণ ভাবে গ্রীষ্মকালীন মুগের হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৮-১০ কুইন্টাল।


0 Comments