ভুট্টা চাষের ক্ষতিকারক শত্রু ফল আর্মিওয়ার্মের নিয়ন্ত্রণ
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য-ফসল ভুট্টা। কিন্তু সতর্ক না থাকলে বিবিধ রোগ আর পোকার আক্রমণ ভুট্টা চাষের প্রভৃত ক্ষতি করতে পারে। ভুট্টার সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা ফল আর্মিওয়ার্ম। কী করে এই পোকার আক্রমণের হাত থেকে ফসলকে বাঁচাবেন, তারই উপায় বলে দিচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম কৃষিঅধিকর্তা সৌমেন্দ্রনাথ দাস
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দানাশস্য ভুট্টা। ধান ও গমের পরই এর স্থান। লাভজনক হওয়ায় এই দানাশস্যের চাষ রাজ্যে দ্রুত হারে বাড়ছে। কাঁচা এবং শুকনো দানা হিসাবে ভুট্টার বেশ চাহিদা রয়েছে বাজারে। এছাড়াও পশুখাদ্য হিসেবেও এর গাছ ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে পোলট্রি ও মাছের খাবার তৈরি করার জন্য ভুট্টার দানার ব্যবহার দ্রুত হারে বাড়ছে। ভুট্টাভিত্তিক বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্য এই রাজ্যে উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এগুলির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদিত ভুট্টা এবং বিহার থেকে আমদানি করা ভুট্টার উপর নির্ভর করে, উত্তরবঙ্গের মালদা জেলার পুরাতন মালদা ব্লকে দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভুট্টানির্ভর শিল্পোদ্যোগ গড়ে উঠেছে। ভুট্টা মূলত খরিফ, রবি ও গ্রীষ্মের মরসুমে চাষ করা হয়। সর্বাধিক ভুট্টা চাষের এলাকা রয়েছে উত্তর দিনাজপুর জেলায়। এছাড়াও এই রাজ্যের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, মালদা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ এবং পুরুলিয়া জেলায় ভুট্টার চাষ হয়। বর্তমানে পশ্চিমরঙ্গে প্রায় ২ লক্ষ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে এই ফসলের চাষ হচ্ছে।
ভুট্টা চাষের জন্য বীজের সঙ্গে সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হয়। অতীতে ভুট্টা চাষে সেরকম কোনও মারাত্মক ক্ষতিকারক রোগ ও পোকার সমস্যা দেখা যেত না। তবে, ইদানীং এই ফসলে রোগ ও পোকার আক্রমণ চাষিদের বিপাকে ফেলছে। রোগ ও পোকার আক্রমণে ভুট্টা চাষে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। ইদানীং ভুট্টার জমিতে ফল আর্মিওয়ার্ম নামক এক বহিরাগত পোকার উপস্থিতির জন্য চাষের ক্ষতি বেশি হচ্ছে। ২০১৮ সালে প্রবল ক্ষতিকারক এই পোকাটির আমেরিকা থেকে ভারতে আগমন ঘটে। 'আমাদের রাজ্যে এই পোকাটি বর্তমানে ভুট্টা চাষে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফল আর্মিওয়ার্ম 'ভুট্টাগাছের পাতা ও কচি বাড়ন্ত কাণ্ডের ডগা খেয়ে ফসলের ক্ষতি করে। মূলত এই পোকার লার্ভা বা ক্রীরাগুলি হল ক্ষতির কারণ। লার্ভার মাথার ঠিক উপরে উলটো ইংরেজি 'ওয়াই' চিহ্ন এবং পিছনের দিকে চারটি কালো রঙের টিপ বর্গাকারে সজ্জিত থাকলে বুঝতে হবে এটি ফল আর্মিওয়ার্ম।
সাধারণত গাছের উপরের দিকে থাকা পাতাগুলিতে এদের আক্রমণ দেখতে পাওয়া যায়। পাতাগুলির যে-অংশ কাণ্ডের সঙ্গে লেগে থাকে, ঠিক সেই গর্তের মধ্যেই পোকা দেখতে পাওয়া যায়।
ভুট্টা চাষের খেতে, গাছের পাতার উপর বিভিন্ন আকারের অসংখ্য ছিদ্র চোখে পড়লেই বুঝতে হবে এই পোকার আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। এছাড়াও পাতার উপরিভাগে পোকার মলও দেখতে পাওয়া যায়। পোকার লার্ভাগুলি ভুট্টা গাছের কচিপাতা ও ট্যাসেল খাবার হিসেবে পছন্দ করে।
ফল আর্মিওয়ার্ম পোকাটি ভুট্টা খেতে এসেছে কিনা বোঝার জন্য, ফেরোমোন ফাঁদ জমিতে একর প্রতি চার-পাঁচটি করে বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করতে হবে। এই ফাঁদে পুরুষ মথ ধরা পড়লেই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, ভুট্টার জমিতে এই পোকার আগমন ঘটেছে।
এছাড়াও নিয়মিত জমি পরিদর্শন করা উচিত। জমি পরিদর্শনে যদি দেখা যায়, চারা বের হওয়ার ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে ১-৫টি গাছ ক্ষতিগ্রস্ত, তাহলেই পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও চারাগাছ বের হওয়ার ৫-৭সপ্তাহ পর্যন্ত যদি ৬-১০টি গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলেই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের সময় হয়ে গেছে, বুঝতে হবে।
ভুট্টা গাছকে ফল আর্মিওয়ার্মের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে হলে নিম্নলিখিত শস্যসুরক্ষা জনিত ব্যবস্থাগুলি চাষিদের গ্রহণ করতে হবে।
* ভুট্টার বীজ বপনের আগে জমির মাটি গভীর ভাবে চাষ দিয়ে রোদে ১০-১৫ দিন ফেলে রাখতে হবে। এর ফলে মাটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই পোকার পিউপাগুলি বন্ধুপোকা এবং পাখিরা খেয়ে ফেলবে।
* চাষের জমিতে গাছের বয়স ৩০-৪৫ দিন হওয়া পর্যন্ত পাখি বসার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
* জমির মধ্যে ঘুরে ঘুরে হাত দিয়ে এই পোকার ডিমের গাদা এবং লার্ভাগুলি তুলে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
* পরিণত লার্ভাগুলিকে মেরে ফেলার জন্য বিষটোপ ব্যবহার করতে হবে। প্রতি হেক্টর জমির জন্য, ১০ কেজি চালের কুঁড়ো ও ২ কেজি ঝোলাগুড়ের সঙ্গে ২-৩ লিটার জল মিশিয়ে এটি ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত রেখে দিতে হবে। তারপরে এই বিষটোপ মাঠে প্রয়োগের ঠিক ৩০ মিনিট আগে'ওই মিশ্রণের সঙ্গে ১০০ গ্রাম থায়োডিকার্ব (৭৫ ডব্লু পি) মেশাতে হবে এবং গাছের পাতা ও কাণ্ডের সঙ্গে লেগে থাকা গর্তের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে।
* ভুট্টা চাষের জমির চারপাশে নেপিয়ার ঘাস ফাঁদ-ফসল হিসেবে লাগালে এই পোকার আক্রমণ কম হবে।
* ভুট্টা খেতে বন্ধুপোকা হিসেবে লেডিবার্ডবিটল, লেসউইংবাগ এবং পাইরেট বাগ সংরক্ষণ করলে এই পোকার উপদ্রব অনেকাংশে কমানো যাবে।
* প্রতি কেজি ভুট্টাবীজের সঙ্গে ১০-২০ মিলি ও ৪ মিলি সায়ান ট্রানিলিপ্রোল (১৯.৮%) থায়োমিথোক্সাম (১৯.৮%) এফএস ভালো করে মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। এর ফলে ভুট্টার গাছ, বীজ বোনার পর ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকবে।
* চারা অবস্থায় গাছে ৫ নিমবীজের নিষ্কাশন স্প্রে করলেও সুফল পাওয়া যাবে।
* ক্ষতির মাত্রা বেশি হলেই স্পিনেটোরাম ১১.৭% এস সি প্রতি লিটার জলে ১ মিলি হিসেবে মিশিয়ে আক্রান্ত গাছে স্প্রে করতে হবে। কীটনাশক স্প্রে করার ৩-৪ সপ্তাহ পরে ফসল কাটা উচিত।

0 Comments