পাট চাষে রোগ-পোকার সমস্যা ও তার প্রতিকার

পাট পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ফসল। এ রাজ্যে প্রচুর পরিমাণে পাটের উৎপাদন হয়। তবে যে-সময়ে এ রাজ্যে পাট চাষ করা হয়, জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সেই সময়ই গাছে রোগ ও পোকার আক্রমণ হয় সবচেয়ে বেশি। এমন অবস্থায় কৃষকেরা কী সতর্কতা নেবেন, রোগ-পোকার আক্রমণ কী ভাবে ঠেকাবেন, তা-ই জানাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম কৃষিঅধিকর্তা সৌমেন্দ্রনাথ দাস।

পাট চাষে রোগ-পোকার সমস্যা ও তার প্রতিকার


পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান অর্থকারী ফসল পাট। এটি মূলত তত্ত্বজাতীয় ফসল। এর ব্যবহার-উপযোগী অংশটি হল ফাইবার বা আঁশ। আঁশ উৎপন্ন হয় গাছের কাণ্ডের একাবারে বাইরে থাকা-ছালের মধ্যে। ভারতের অন্যতম প্রধান পাট উৎপাদনকারী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। এই রাজ্যে পাট চাষের জমির পরিমাণ পাঁচ লক্ষ হেক্টর। প্রধান পাট উৎপাদক জেলা-কোচবিহার, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, হাওড়া, হুগলি এবং উত্তর ২৪ পরগনা। মূলত গাঙ্গেয় সমতলভূমি পাট চাষের উপযুক্ত জায়গা। মার্চ এবং এপ্রিল মাস বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। রাজ্যের সিংহভাগ পাট চাষের জমি মিঠা পাটের আওতাভুক্ত। পাট সাধারণত দু' প্রকার, তিতা ও মিঠা।

পাটচাষিদের প্রতি বছর চাষের সময় বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সমস্যা শুরু হয় বীজ বোনার সময় জলাভাব দিয়ে। বীজ বোনার সময় দু'-এক পশলা বৃষ্টি হলে বীজ বোনার কাজটি অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। সেচসেবিত এলাকায় বৃষ্টি না হলে সেচের জলই ভরসা।

এ ছাড়াও পাট চাষে রোগ এবং পোকার আক্রমণজনিত সমস্যা হয়। পাটগাছের বৃদ্ধির সময় উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু থাকে। এমন আবহাওয়া রোগ আর পোকার আক্রমণের জন্য অনুকূল।

কী-কী রোগ

কাণ্ড পচা: মূলত, ছত্রাকঘটিত রোগ। চারা অবস্থা থেকে পরিণত গাছেদের এই রোগ হতে পারে। এই ক্ষেত্রে বাড়ন্ত গাছের পাতার উপরিভাগে, এমনকী ডাঁটিতেও কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায়। কাণ্ডের উপরিভাগে থাকা ছাল ফেটে আঁশগুলি বের হতে দেখা যায়। পরবর্তী সময় গাছের পাতাগুলি ঝরে পড়ে, কাণ্ড পচে যায় এবং আক্রান্ত গাছ মারাও যায়। পাটগাছের ফল এবং বীজগুলিও আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পায় না। এমন মারণ রোগের আক্রমণ থেকে পাটগাছকে রক্ষা করতে হলে-

* বীজ শোধন করতে হবে

* জমি থেকে দ্রুত জলনিকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে

* দেখা গেছে অম্ল মাটিতে এই রোগের প্রকোপ বেশি হয়, তাই জমিতে চুন প্রয়োগ করে মাটির অম্লত্ব কমাতে হবে

* আক্রান্ত গাছে কপার অক্সি-ক্লোরাইড (প্রতি লিটার জলে ৪ গ্রাম হিসেবে মিশিয়ে) দ্রবণ স্প্রে করে এই রোগ ঠেকানো যাবে।

ঝিমিয়ে পড়া: এই রোগটি মূলত মাটিবাহিত ছত্রাকের আক্রমণে শুরু হয়। গাছের শিকড়গুলি প্রথমে আক্রান্ত হয়। গাছের পাতাগুলি ঝরে পড়ে। মিঠা পাটের গাছগুলিতে ঠিক ফুল আসার আগেই রোগটির উপদ্রব হয় সবথেকে বেশি। মাটি এবং বীজের মাধ্যমেই এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগের আক্রমণ ঠেকাতে গেলে-

* জমিতে পড়ে থাকা আবর্জনা তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে

* আক্রমণের শুরুতে গাছে ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি লিটার জলে ২.৫ গ্রাম হিসেবে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে

* গাছের গোড়ায় জমে থাকা জল দ্রুত নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে

পোকার আক্রমণ

বিছাপোকা: এই পোকার কীড়াগুলি দলবদ্ধ অবস্থায় পাতার নীচের দিকের সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে পাতাগুলিকে পাতলা জালের মতো করে দেয়। কীড়াগুলি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং পাতাগুলি খেতে শুরু করে।

* আক্রমণের শুরুতেই, পাতাসমেত কীড়াগুলি সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে

আক্রমণের তীব্রতা বেশি হলে ডায়াজিনন ৬০ ইসি অথবা সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক রিপর্কড ১০ ইসি প্রতি লিটার জলে ০.৫ মিলি হিসেবে মিশিয়ে জমিতে স্প্রে করতে হবে

ঘোড়া পোকা: পাটগাছের মারাত্মক ক্ষতি করে এই পোকা। জুন-জুলাই মাসে এটির আক্রমণ বাড়ে। গাছের ডগার দিকে থাকা কচি পাতাগুলি এরা খেয়ে ফেলে। এর ফলে গাছের বর্ধনশীল ডগাগুলি নষ্ট হয়ে যায় এবং পাশ থেকে শাখা-প্রশাখা উৎপন্ন হয়। এই পোকার আক্রমণ রুখতে-

* কেরোসিনে ভেজানো দড়ি গাছের উপর দিয়ে টেনে দিতে হবে

* জমিতে পাখি বসার জন্য ডালপালা পুঁতে রাখতে হবে। তাহলে পাখিরা পোকা খেয়ে ফেলবে। পোকার সংখ্যাও দ্রুত কমে যাবে

* আক্রমণ বেশি হলে ডায়াজিনন ৬০ এসি অথবা রিপর্কড ১০ ইসি প্রতি লিটার জলে ০.৫ মিলি হিসেবে নিশিয়ে আক্রান্ত গাছগুলিতে স্প্রে করতে হবে 

হলুদ মাকড়: 

এই পোকাগুলি গাছের ডগার দিকে থাকা পাতার রস চুষে খায়। এর ফলে আক্রান্ত পাতাগুলি কুঁকড়ে যায় এবং তামাটে রং ধারণ করে। আক্রমণ বেশি হলে গাছের পাতা ঝরে পড়ে, গাছের ডগা নষ্ট হয়ে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং শাখা-প্রশাখা উৎপন্ন হয়।

পোকার আক্রমণ অধিক হলেই ফেনাজাকুইন ১০ ইসি প্রতি লিটার জলে ২ মিলি অথবা সালফার ৮০ ডব্লুপি প্রতি লিটার জলে ২ গ্রাম হিসেবে মিশিয়ে আক্রান্ত গাছে স্প্রে করতে হবে।

হঠাৎ করে প্রচুর বৃষ্টি হলে আপনা থেকেই পোকার আক্রমণ কমে যায়।

Post a Comment

0 Comments