সবুজ সার ধইঞ্চা জৈব সার

সবুজ সার ধইঞ্চা

সবুজ সার ধইঞ্চা  জৈব সার


রাসায়নিক সারের বদলে জমিতে জৈব সার প্রয়োগ লাভজনক এই কারণে যে, তার ভিতরে থাকা মাটির খাদ্য-উপাদান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরী থাকে এবং তুলনায় অনেক কম খরচে কৃষকেরা নিজেদের জমিতে সহজে এই জৈব সার উৎপাদন করে নিতে পারেন। বর্ষা ভালো ভাবে আসার আগেই জমিতে সবুজ সার, ধইঞ্চার চাষ করা যায়। বাসায়নিক সারের প্রয়োগ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের সমূহ ক্ষতি করে। সবুজ সার তা ঠেকাবে। জানাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম কৃষিঅধিকর্তা সৌমেন্দ্রনাথ দাস।

চাষে আশানুরূপ ফলন পেতে হলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি চাষের জন্য মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখা দরকার। আর এ জন্যই জৈব সারের প্রয়োগ আবশ্যিক। জৈব সারে প্রধান খাদ্য-উপাদান নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ ছাড়াও বেশ কিছু অণুখাদ্য মজুত থাকে। যদিও সেগুলি পরিমাণে রাসায়নিক সারের তুলনায় অনেকটাই কম। তবে জৈব সার প্রয়োগ করলে, জমির মাটির মধ্যে এই সব প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য-উপাদানগুলি দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকরী থাকে। নানান রকমের জৈব সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেমন- আবর্জনা বা কম্পোস্ট সার, গোবরসার, কেঁচোসার, পোলট্রি সার, খইল এবং সবুজ সার।

সবুজ সার কী উপকার করে

সবুজ সার ব্যবহার করলে নানান ভাবে কৃষকের জমির উপকার হয়-

  1. মাটির গ্রন্থন উন্নত হয়। এ ছাড়াও মাটির মধ্যে বাতাস চলাচল সাবলীল হয়।
  2. মাটির জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়-
  3. মাটিতে প্রধান ও অণুখাদ্য-উপাদানের জোগান বাড়ে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়
  4. মাটির মধ্যে বসবাসকারী উপকারী জীবাণুদের কার্যকারিতা বাড়ে
  5. ফসলের উৎপাদন ও গুণমান বৃদ্ধি পায়
  6. মাটির মধ্যে মজুত হওয়া খাদ্য-উপাদানগুলি দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যকরী থাকে

সবুজ সার ধইঞ্চার কার্যকারিতা

ধইঞ্চা একটি উল্লেখযোগ্য সবুজ সার। ধইঞ্চা শিম্ব গোত্রীয় উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদের মাটির নীচে থাকা শিকড়ের উপরিভাগে অসংখ্য গুটি উৎপন্ন হয়। শুটির মধ্যে রাইজোবিয়াম প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু বসবাস করে, যাদের বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে আবদ্ধকরণের অসীম ক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়াও এই উদ্ভিদের মাটির উপর উৎপন্ন হওয়া পাতা সমেত ডালপালার মধ্যেও প্রধান খাদ্য ও অণুখাদ্য-উপাদান মজুত রয়েছে, যা পচনের মাধ্যমে জৈব সারে পরিণত হওয়ার পর মাটিতে মিশিয়ে দিলে মাটির উর্বরতা দীর্ঘ সময়ের জন্য বৃদ্ধি পাবে। বৃদ্ধির সময় ধইঞ্চা মাটির উপরিভাগ ঢেকে রাখে, তার ফলে জমিতে আগাছার উপদ্রব অনেক কম হয়

ধইঞ্চার আবশ্যিক গুণাবলি

সবুজ সার তৈরির জন্য ধইঞ্চা-র নিম্নলিখিত গুণগুলি থাকতে হবে-

  1. গাছকে শিম্ব গোত্রীয় উদ্ভিদ হতে হবে
  2. দ্রুত বেড়ে ওঠার ক্ষমতা থাকতে হবে
  3. মাটিতে প্রয়োগের পর দ্রুত পচে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে হবে
  4. ধইঞ্চা গাছের ডালপালা কচি ও নরম হতে হবে
  5. রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে গাছকে মুক্ত হতে হবে

বীজ বোনা

বর্ষার ঠিক আগে ধইঞ্চা বীজ বোনার জন্য তৈরি থাকতে হবে। বর্ষা পুরোমাত্রায় আসার আগেই হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে ফাঁকা জমিতে ধইঞ্চার বীজ ছিটিয়ে বুনে দিতে হবে। বিঘা প্রতি ১.৫-২ কেজি বীজের প্রয়োজন হবে। বপনের পূর্বে প্রয়োজনে বীজগুলি ৮-১০ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে নিলে ভালো হয়। এর ফলে মাটিতে ছড়ানো বীজের অঙ্কুরোশম দ্রুত হয়।

বাড়ন্ত গাছ জমিতে মিশিয়ে দেওয়া

ফুল আসার আগে, গাছের বয়স ৩০-৪০ দিন হলেই নরম ডালপালা সমেত সমগ্র ধইঞ্চার গাছকে লাঙলের সাহায্যে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। বর্ষাকালীন বৃষ্টির জলে, মাটিতে পড়ে থাকা ধইঞ্চা গাছ পচে, মাটির সঙ্গে জৈব সার হিসেবে মিশে যাবে। সঠিক ভাবে পচনের জন্য ১৫ দিন সময় দিতে হবে। বর্ষাকালীন আমন ধান চাষের জন্য সবুজ সার খুবই উপযুক্ত।

খাদ্য-উপাদানের পরিমাণ

১ বিঘা জমিতে ধইঞ্চা সবুজ সার হিসেবে চাষ করে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার ফলে এর শিকড়ে উৎপন্ন হওয়া গুটিগুলির মাধ্যমে মাটির সঙ্গে ৮-১০ কেজি নাইট্রোজেন যুক্ত হবে, যা সাধারণত ১৮-২২ কেজি ইউরিয়া সারের থেকে পাওয়া যায়। এ ছাড়াও গাছের পাতা ও ডালপালার মাধ্যমে যে-পরিমাণ সবুজ সার উৎপন্ন হবে তার পরিমাণ ২-২.৫ মেট্রিক টন। সবুজ সারের মধ্যে পাওয়া যাবে প্রায় ৩.৫ শতাংশ নাইট্রোজেন, ০.৬ শতাংশ ফসফরাস এবং ১.২ শতাংশ পটাশ। তুলনায় অনেক কম খরচে নিজের জমিতেই কৃষকেরা সবুজ সার তৈরি করে নিতে পারবেন।

Post a Comment

0 Comments