গ্রীষ্মকালীন ঢ্যাঁড়সের চাষ
গ্রীষ্মকালই ঢ্যাঁড়স চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ফল ধরতে বেশি সময় লাগে না। সে জন্য বাজারে খুব দ্রুত বিক্রির জন্য আনা যায়। তবে বেশ কিছু রোগ আর রোগপোকা ফলনকে ব্যাহত করতে পারে। ঢ্যাঁড়স চাষের খুঁটিনাটি জানাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম কৃষিঅধিকর্তা সৌমেন্দ্রনাথ দাস।
বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় অর্থকরী সবজি ঢ্যাঁড়স। এটি গ্রীষ্ম ও বর্ষা, উভয় ঋতুর সবজি। বীজ বপনের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফসল তোলার উপযুক্ত হয়ে ওঠে। অল্প খরচে ও স্বল্প সময়ের মধ্যে এই সবজির চাষ করে যথেষ্ট লাভ করা যায়। এ কারণেই ঢ্যাঁড়সের চাষ এই রাজ্যের কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে অল্প শীত থাকাকালীন অঙ্কুরিত ঢ্যাঁড়সের বীজ বপনের মাধ্যমে কৃষক গ্রীষ্মকালের শুরুতেই বাজারে ঢ্যাঁড়স বিক্রির জন্য আনতে পারবেন। প্রথম দিকে উৎপাদিত ঢ্যাঁড়সের আকার তুলনামূলক ভাবে ছোট থাকলেও এবং উৎপাদন কম হলেও, অগ্রিম বাজারে আসার ফলে অনেক বেশি দাম পাওয়া যাবে। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢ্যাঁড়সের ফলন বাড়তে থাকবে। তাই আর দেরি না করে অবিলম্বে ঢ্যাঁড়সের চাষে নেমে পড়তে হবে।
জলবায়ু ও মাটি: ঢ্যাঁড়স মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া পছন্দ করে। ৩৫-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এর জন্য উপযোগী। পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পায়, এমন উঁচু ও মাঝারি অবস্থানের জমি হল এই সবজির জন্য আদর্শ। চাষের মাটি হতে হবে উর্বর, দোঁয়াশ এবং জমি হতে হবে সুনিকাশি ব্যবস্থাসম্পন্ন।
জাত: গ্রীষ্মকালীন ঢ্যাঁড়স চাষের জন্য উপযুক্ত উন্নত ও উচ্চ-ফলনশীল জাতগুলি হল- অর্কঅভয়, অর্কনামিকা, পর্বনীক্রান্তি, বিধান প্রভাকর এবং পাঞ্জাব-৭। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ উদ্ভাবিত অ্যান্থসায়নিন সমৃদ্ধ উচ্চফলনশীল জাত হল পুসালাল ভেন্ডি-১ এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ভেজিটেবল রিসার্চের দ্বারা উদ্ভাবিত জাতটি হল কাশী লালিমা।
জমি তৈরি: ৬ ইঞ্চি গভীরতা পর্যন্ত চাষ দিয়ে জমির মাটি ১০ দিন রোদে ফেলে রেখে শুকিয়ে নিতে হবে। পরে আড়াআড়ি চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নেওয়ার পর আগাছামুক্ত ও সমতল করতে হবে। নিকাশি নালা এবং চলাচলের ব্যবস্থা রেখে জমিকে কয়েকটি খণ্ডে ভাগ করে নিতে হবে।
বীজ বোনা: বীজ বপনের আগে অবশ্যই বীজ শোধন করতে হবে। প্রতি কেজি বীজ, ২ গ্রাম পরিমাণ থাইরাম অথবা ব্যাভিসটিনের সঙ্গে মাখিয়ে শোধন করতে হবে। গ্রীষ্মকালীন চাষের জন্য বিঘা প্রতি ২ কেজি পরিমাণ বীজ লাগবে।
বীজের ত্বক বা খোসা শক্ত হওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টা রোদে উষ্ণ করা জলে ভিজিয়ে নিতে হবে। বপনের পূর্বে বীজ অঙ্কুরিত করে নিতে পারলে খুব ভালো হয়। সারি থেকে সারি ৪৫ সেন্টিমিটার এবং বীজ থেকে বীজের দূরত্ব হতে হবে ৩০ সেন্টিমিটার। বপনের পরে আবর্জনা মিশ্রিত মাটির সাহায্যে বীজগুলিকে ঢেকে দিলে শীঘ্রই অঙ্কুরিত হবে।
সার প্রয়োগ: জমি তৈরির সময় মূল সার হিসেবে বিঘা প্রতি ১.৫-২ টন কম্পোস্ট অথবা গোবর সার, ৭ কেজি ফসফরাস ও পটাশ এবং ৫.৫ কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি ৫.৫ কেজি নাইট্রোজেন বীজ বোনার ২১ দিন পর অর্ধেক এবং ৪২ দিন পর বাকি অর্ধেক চাপান হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। মাটি অম্ল হলে বিঘা প্রতি ১৫০-২০০ কেজি পরিমাণ চুন, চাষের ১ মাস আগে মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে।
সেচ: মাটিতে জলের অবস্থা এবং আবাহাওয়া বুঝে ৫-৭ দিন অন্তর হালকা সেচ দিতে হবে।
পরিচর্যা: বীজ বপনের পর, ১৫ দিন অন্তর একবার করে মোট দু'বার, নিড়ানির সাহায্যে আগাছা তুলে ফেলতে হবে। জমি থেকে অতিরিক্ত জল নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। গাছের গোড়া সংলগ্ন মাটি খুঁচিয়ে হালকা করে দিতে হবে এবং বাড়ন্ত গাছের গোড়ায় মাটি ধরাতে হবে।
ফসল তোলা: ফুল ফোটার পর থেকে ৩-৪ দিনের মধ্যেই এর ফল তোলার উপযুক্ত হয়ে ওঠে। দেরি করলেই ফলগুলি শক্ত এবং ছিবরেটে হয়ে যাবে এবং খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যাবে। এমন ঢ্যাঁড়সের বাজারে আশানুরূপ দাম পাওয়া যায় না। ফলন: গ্রীষ্মকালীন ঢ্যাঁড়সের গড় ফলন হবে বিঘা প্রতি ৫-৬ কুইন্টাল।
ফসলের সুরক্ষা: ঢ্যাঁড়স চাষে রোগ এবং পোকার আক্রমণ কৃষকদের সমস্যায় ফেলে। সাধারণত যেসব রোগ ও পোকার আক্রমণ ঢ্যাঁড়সে হয়, সেগুলি হল-সাহেব রোগ: এটি ভাইরাস বাহিত মারাত্মক ক্ষতিকারক রোগ। সাদা মাছি নামক পোকা এই ভাইরাস বহন করে। আক্রান্ত গাছের পাতার উপর সবুজ ও হলুদ দাগ বা ছোপ দেখেই রোগটির শনাক্তকরণ করা যায়। গাছ ঠিকমতো বাড়ে না এবং ফলন ভীষণ ভাবে কমে যায়। প্রতিকার হিসাবে আক্রান্ত গাছগুলিকে তুলে মেরে ফেলতে হবে। ভাইরাস বাহক সাদা মাছিকে নিয়ন্ত্রণ করতে রোগর প্রতি লিটার জলে ২ মিলিলিটার অথবা ইমিডা ক্লোরোপিড প্রতি লিটার জলে ০.২ মিলিলিটার হিসেবে মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর দু'বার স্প্রে করতে হবে।
ফল ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা: এই পোকার লার্ভা বা ক্রীরাগুলি বাড়ন্ত গাছের নরম
ডগা এবং কচি ফলকে ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে যায়। আক্রান্ত ডাল শুকিয়ে মারা যায় এবং ফলগুলি খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না। প্রতিকার হিসেবে আক্রান্ত ডাল ও ফলগুলি তুলে নষ্ট করে ফেলতে হবে। এর পর গাছে নুভান প্রতি লিটার জলে ১ মিলিলিটার হিসেবে অথবা সানভেক্স প্রতি লিটার জলে ১ গ্রাম হিসেবে মিশিয়ে নিয়ে ১৫ দিন অন্তর দু'বার স্প্রে করতে হবে।
জ্যাসিড: এই পোকাটি সবুজ রঙের। পাতার নিচ থেকে রস চুষে খায়। এর ফলে আক্রান্ত পাতাগুলি হলদে হয়ে উপর দিক বরাবর কুঁচকে যায়। পাতাগুলি খসখসে এবং পাঁপড়ের মতো হয়ে যায়। আক্রান্ত গাছগুলি ঠিকমতো বাড়ে না এবং ফলনও ভীষণ ভাবে কমে যায়। প্রতিকার হিসেবে আক্রান্ত গাছে প্রতি লিটার জলে ২ গ্রাম - ড্যানটপ মিশিয়ে স্প্রে করলে জ্যাসিডের আক্রমণ কমানো যাবে।

0 Comments