গ্রীষ্মকালীন কলাই ডালশস্যের চাষ
গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালীন ফসল হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে কলাইয়ের চাষ করা হয়। এই চাষের জন্য প্রয়োজন জলনিকাশির সুবিধাযুক্ত জমি আর হালকা জলসেচ। রোগ-পোকার আক্রমণ খুব বেশি হয় না। যেটুকু হয়, তা আগাম কিছু সতর্কতা নিলে ঠেকানো যায়। জানাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম কৃষিঅধিকর্তা সৌমেন্দ্রনাথ দাস।
ডালশস্য কলাই মূলত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালেই চাষ করা হয় পশ্চিমবঙ্গে। কলাই ডালে ১৭-২০ শতাংশ প্রোটিন ছাড়াও ফাইবার, কার্বোহাইড্রেট, খনিজ মৌল এবং প্রচুর পরিমাণে লাইসিনের মতো অ্যামিনো অ্যাসিড মজুত থাকে।
মাটি :
গ্রীষ্মকালীন কলাই চাষের জন্য দোঁয়াশ বা বেলে-দোঁয়াশ মাটি আদর্শ। জলনিকাশির সুবিধা সহ উঁচু ও মাঝারি অবস্থানের জমিই সবচেয়ে উপযুক্ত।
জাত :
পশ্চিমবঙ্গে গ্রীষ্মকালে কলাইচাষের উপযুক্ত জাতগুলি হল- সারদা, গৌতম, বসন্তবাহার, পন্থইউ-৩১, ইউ-১। পিডিইউ-১, উত্তরা এবং আজাদ
জমি তৈরি ;
কলাই চাষের জমি তৈরির জন্য প্রথমে ৪-৫ বার লাঙল দিয়ে জমি চাষ দিতে হবে। আগাছা তুলে ফেলে মাটিকে ঝুরঝুরে করে নেওয়ার পর সমতল করে নিতে হবে। জলনিকাশের সুব্যবস্থা রাখতে হবে।
বীজ বপন :
গ্রীষ্মকালীন চাষের জন্য মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত উপযুক্ত সময়। ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্ব রেখে সারিতে বীজ বপন করতে হবে। এ জন্য বিঘাপ্রতি ৩-৪ কেজি বীজের প্রয়োজন। বপনের ৭ দিন আগে প্রতি কেজি বীজের জন্য ২ গ্রাম পরিমাণ থাইরাম মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব রাখতে হবে ১০ সেন্টিমিটার। কলাই চাষে হালকা সেচ দেওয়া প্রয়োজন।
জীবাণুসার :
ডালশস্য চাষে জীবাণুসার প্রয়োগ অত্যন্ত আবশ্যক। বিঘাপ্রতি প্রয়োজনীয় বীজের সঙ্গে রাইজোবিয়াম প্রজাতির জীবাণুসার ২০০ গ্রাম হিসেবে, জল অথবা ঠান্ডা করা ভাতের ফেনের সঙ্গে মিশিয়ে, লেই তৈরি করে, বীজের গায়ে মাখিয়ে ছায়াতে রেখে শুকিয়ে নিতে হবে।
মাটি শোধন ও অণুখাদ্য প্রয়োগ :
অম্লমাটি কলাই চাষের জন্য অনুপযুক্ত। জমির মাটি অম্লযুক্ত হলে বীজ বোনার ৩০-৪৫ দিন আগে মাটিতে বিঘাপ্রতি ৮০-১০০ কেজি চুন প্রয়োগ করতে হবে। বোরন ও মলিবডেনাম অণুখাদ্যের অভাব থাকলে, প্রতি লিটার জলে ১ গ্রাম বোরন ২০ এবং ০.৫ গ্রাম সোডিয়াম মলিবডেট মিশিয়ে নেওয়ার পর গাছে ফুল আসার আগে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যাবে।
আগাছা নিয়ন্ত্রণ :
বীজ বোনার ২১ দিন পর নিড়ানির সাহায্যে আগাছা তুলে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত চারা গাছগুলিকেও তুলে ফেলতে হবে। ৪২ দিন পর দ্বিতীয় বার আগাছা তুলে ফেলতে হবে।
জলসেচ :
আবহাওয়া ও মাটির অবস্থা বুঝে হালকা জলসেচ করতে হবে। গাছে ফুল আসার আগে এবং ফল পরিপক্কতার সময় অবশ্যই সেচ দিতে হবে।
ফসল চয়ন :
মোটামুটি ভাবে ৮০-৮৫ গাছে ফল পেকে গেলেই শুঁটি সমেত গাছগুলি জমি থেকে কেটে ঘরে নিয়ে আসতে হবে।
শস্য সুরক্ষা :
গ্রীষ্মকালীন কলাই চাষে রোগ ও পোকার আক্রমণ ততটা প্রকট হয় না। তবে রোগের মধ্যে ছত্রাকঘটিত, গাছের ঢলে পড়া দেখা দিতে পারে। পূর্ণবয়স্ক আক্রান্ত গাছের পাতা হলুদ রং ধারণ করে, ঢলে পড়ে এবং শুকিয়ে মারা যায়। আক্রান্ত বীজ অথবা মাটিবাহিত ছত্রাক রোগজীবাণুর মাধ্যমে এই রোগের আক্রমণ ও বিস্তার ঘটে। এই রোগের আক্রমণ ঠেকাতে বীজ শোধন এবং মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।
অনেক সময় শুঁটিছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। পোকার লার্ভা বা ক্রীরাগুলি ফুলের কুঁড়ি, ফুল এবং ফল অর্থাৎ শুটিকে আক্রমণ করে। ফলের ভিতরে থাকা নরম বীজগুলিকে খেয়ে ফেলে কলাই ডালশস্যের ক্ষতি করে। এই পোকার আক্রমণ ঠেকাতে হলে সাবান বা সার্ফের দ্রবণের সঙ্গে নিমবীজের ৫ নির্যাস স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যাবে।

0 Comments